গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লাদাখে ক্রমশই ভারত-চিন উত্তেজনা বাড়ছে। নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে টহলদারির নামে শুধু ভারতের সীমান্তের মধ্যে ঢুকে পড়াই নয়, প্যাঙ্গং লেকের কাছে সেনা মোতায়েনও রাতারাতি বাড়িয়ে দিয়েছে চিন। গালওয়ান উপত্যকায় অন্তত একশ তাঁবু দেখা গিয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মির। এরই মধ্যে চাঞ্চল্যকর এক উপগ্রহ চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্যাঙ্গং লেকের মাত্র ২০০ কিলোমিটারের দূরে পুরোদস্তুর বিমানঘাঁটি গড়ে তুলছে চিন। শুধু তাই নয়, টারম্যাকে  দেখা গিয়েছে  যুদ্ধ বিমানও।

লাদাখে প্যাঙ্গং লেকের ২০০ কিলোমিটার দূরে তিব্বতের ‘গাড়ি কুনসা’য় অসামরিক বিমান পরিবহণের জন্য চীনের একটি বিমানবন্দর ছিল। কিন্তু উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছে, গত মাসে ওই বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের কাজ রাতারাতি বেড়ে গিয়েছে। এবং সেখানকার টারম্যাকে যুদ্ধবিমানও দাঁড় করিয়ে রেখেছে চিনা বায়ুসেনা।

লাদাখে নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর টহলদারির সময় আকছার চিনা সেনা নিয়্ন্ত্রণ রেখা টপকে ভারতের দিকে চলে আসে, এটা সিকিম সেক্টরেও মাঝে মধ্যে হয়। কিন্তু প্রতিবারই দুই পক্ষের মিলিটারি স্তরে বৈঠকের পর বিরোধের মীমাংসা হয়ে যায়।

নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়ে মে মাসের প্রথম থেকেই প্যাঙ্গং লেকের পূর্ব দিকে প্রচুর পরিমাণে সেনা মোতায়েন করছে চীন। সেনা সূত্রের খবর, প্যাঙ্গং সো এবং গালওয়ান উপত্যকায় দুই থেকে আড়াই হাজার সেনা মোতায়েন করেছে চিন। আগামী দিনে সম্ভবত তারা আরও সেনা আনতে চলেছে। ।এর পাশাপাশি পিপলস লিবারেশন আর্মির বায়ু সেনার বিমানের উপস্থিতি চিন্তার বাড়তি কারণ।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী লাদাখে ভারতের সেনার সংখ্যা প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি। সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কম্যান্ডের লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ডি এস হুদা বলেন, “ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস। একে ছোটখাটো অনুপ্রবেশ বলা যাবে না। গালওয়ান অঞ্চলে চিন সেনা মোতায়েন করেছে। অথচ ওই জায়গাটি বিতর্কিত নয়। তা ভারতের সীমানার মধ্যেই পড়ে।”

কিছুদিন আগের ঘটনা অনুযায়ী

গত ৫ মে এবং ৯ মে লাদাখের প্যাঙ্গং লেকের কাছে ভারতীয় ও চিনের সেনা জওয়ান পরস্পরের সঙ্গে মারপিট, ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে। তাতে দু’পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।

সেনা সূত্রেই জানা গিয়েছে, লাদাখের পূর্ব দিকে চীন অন্তত একশটি তাঁবু তৈরি করেছে এবং ভারী সরঞ্জাম নিয়ে এসে বাঙ্কার বানাচ্ছে। সেই সঙ্গে সেনা মোতায়েন করতেও শুরু করেছে সেখানে।

পরে ১৯ মে এবং ২১ মে চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণ রেখা টপকে ভারতীয় সেনা চিনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে তাদের সেনাবাহিনীকে টহলদারিতে বাধা দিচ্ছে।

পাল্টা ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, ওয়েস্টার্ন সেক্টরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রমের দাবি সঠিক নয়। ভারতীয় সেনা নিয়ন্ত্রণ রেখার এপারেই ছিল। বরং সম্প্রতি চীন সেনাই বারংবার ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ে স্বাভাবিক টহলদারিতে বাধা দিচ্ছে।

ভারত-চিন সীমান্ত বিবাদ

বস্তুত ভারত-চিন নিয়ন্ত্রণ রেখায় জমিতে স্পষ্ট কোনও সীমা নেই। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত মোটামুটি ভাবে তিন ভাগে বিভক্ত। ওয়েস্টার্ন, মিডল ও ইস্টার্ন। ওয়েস্টার্ন সেক্টরে ‘জনসন লাইন’ Johnson line জম্মু কাশ্মীরের লাদাখ ও আকসাই চিনের মধ্যে সীমারেখা । মিডল সেক্টরে রয়েছে উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল। আর ইস্টার্ন সেক্টরে চিন দাবি করে আসছে অরুনাচল প্রদেশ দক্ষিণ তিব্বতের অংশ। কিন্তু সেই দাবি ধারাবাহিক ভাবে খণ্ডন করে আসছে নয়াদিল্লি।

বস্তুত ওয়েস্টার্ন ও ইস্টার্ন সেক্টরে চিনা সেনা আকছার ভারতের দিকে ঢুকে পড়ে। প্রতিবারই ছোট খাটো ঝগড়া হয়। তবে এই ধরনের হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে দুই পক্ষের সেনা কমান্ডার আলোচনায় বসে সাধারণত তা মিটিয়ে ফেলে।শুধু চুমার ও ডোকালামের ঘটনায় কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছিল।

গালওয়ানে গন্ডগোল

কিন্তু গত কিছুদিন ধরে লাদাখে যা চলছে, তাকে লঘু করে দেখলে ভুল হবে বলেই মনে করছেন কূটনীতিকরা। প্রাক্তন সেনা অফিসাররা অনেকেই মনে করছেন, গোটা ঘটনার মধ্যে বেজিংয়ের একটা সুচিন্তিত মনোভাব রয়েছে। কেন না গালওয়ান উপত্যকায় যা হচ্ছে তা খুবই চিন্তাজনক। কারণ লাদাখের এই উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে কখনও বিবাদ হয়নি।  এর আগে ভারত-চিন সীমান্তে দু’পক্ষের সেনার মধ্যে যতই উত্তেজনা তৈরি হোক না কেন, কোনওরকম অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই তরফেই প্রবল সংযম দেখানো হয়েছে। কিন্তু এখন যে ভাবে চিনা সেনা বারবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ছে তাতে অশান্তির অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে বলেই কূটনীতিকদের একাংশের মত।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি

সীমান্তে চীন সেনার এই অতিসক্রিয়তা এমন সময়ে দেখা যাচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ক্রমশ একঘরে হচ্ছে বেজিং। আমেরিকার সঙ্গে চিনের ঠাণ্ডা যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রতিদিনই একটু একটু বাড়ছে। এমনকি চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই তো  স্পষ্ট অভিযোগ করে বলেছেন, আমেরিকার রাজনৈতিক প্রচার বেজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ককে শীত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেজিং এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কোনও ষড়যন্ত্র নয়, গোটাটাই প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা । এই সংক্রমণের ফলে চিন দুর্বল হয়নি বরং তাদের অর্থনীতি, ঘরোয়া পরিস্থিতি যথেষ্ট চাঙ্গা রয়েছে।

কিন্তু বেজিং যতই চেষ্টা করুক না কেন, কোভিডের কারণে অর্থনৈতিক মন্দার সুযোগ নিয়ে চীনা বাণিজ্যিক সংস্থা যাতে বিনিয়োগের নামে ভারতীয় বাণিজ্যিক সংস্থার উপর আধিপত্য কায়েম না করতে পারে, সে জন্য সতর্ক সাউথ ব্লক ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ নীতিতে বদল এনেছে।

কূটনীতিকদের মতে, কোভিডের কারণে আন্দোলিত হয়েছে শি চিনফিংয়ের গদি। যদিও ঘরোয়া রাজনীতিতে তাঁর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। কিন্তু এও ঠিক ১৯৪৯ সালে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই প্রথম এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২২ মে থেকে ন্যাশনাল পিপলস কনফারেন্স শুরু হয়েছে। মহামারীর কারণে যে অর্থনৈতিক সংকটের পরিবেশে তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যে চিন বিরোধী অক্ষ তৈরি হয়েছে তা ভাবাচ্ছে বেজিংকে।

অনেকের মতে, লাদাখ সীমান্তে অশান্তি তৈরি করে হয়তো দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে চিনফিং প্রশাসন। ঠিক যেমন, ৬২ সালের দুর্ভিক্ষ থেকে নজর ঘোরাতে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন মাও জে দং কিংবা ৭৯ সালে ঘরোয়া অশান্তি থেকে নজর ঘোরাতে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়েছিলেন দেন জিয়াও পিং।

আরও পড়ুন – লাদাখে চীনের সন্দেহজনক গতিবিধি, আশঙ্কা কূটনৈতিক মহলে

কূটনীতিকদের মতে, ঠিক কী কারণে চিন লাদাখে সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। কিছু ধারণা ও আন্দাজ লাগানো হচ্ছে ঠিকই। তবে এও ঠিক, কেবলমাত্র সীমান্তে টহলদারি নিয়ে ঝগড়া বা বচসার কারণে তা করা হচ্ছে ভাবলে ডাহা বোকামি হবে। কারণ, চুমার বা ডোকালামে যে বিবাদ ঘটেছিল তার স্পষ্ট কারণ ছিল। সড়ক নির্মাণ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে বিবাদ তৈরি হয়েছিল তখন। কিন্তু এখন সে রকম কোনও কারণ না থাকাতেই বেজিংয়ে প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।

এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল, চিন সম্পর্কে নয়াদিল্লির নীতি কী হবে সে ব্যাপারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বরাবরই আগ্রাসী। ডোকালামে চিনের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে বার্তা দেওয়ার পক্ষে তিনি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রী জয়শঙ্কর, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার পক্ষপাতী। ডোকালামের সময় উত্তেজনা প্রশমনে বেজিংয়ে ভারতের এই প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে ১৯৬৭ সালে নাথুলায় বা ৮৭ সালে ওয়াংদুতে চিনের অতিসক্রিয়তা তাদের বাড়তি কোনও সুবিধা দেয়নি। তাতে কারও লাভ হয়নি । বরং দু-দেশের স্বার্থেই উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ, সীমান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকলে দু’দেশের সরকারের উপরেই ঘরোয়া রাজনীতিক চাপ তৈরি হবে। তখন খুব বেশি বিকল্প ব্যবস্থা আর নাও থাকতে পারে।

আরও পড়ুন – সীমান্ত সংঘাত, দিল্লিতে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক সেনা আধিকারিকদের সাথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *