সুন্দর ঝলমলে ত্বক, আমাদের খাদ্যাভ্যাসের উপর নির্ভর করে। তবে কিছু বিশেষ খাবার এক্ষেত্রে বেশি কার্যকারী হতে পারে। সময়ের সাথে ত্বক আর মুখে বয়সের ছাপ পড়তে থাকে, ত্বকের লাবণ্যও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আপনিও কি এই সমস্যার সন্মুখীন ? যদিও আজকের দিনে ডায়েট এবং ফিটনেস নিয়ে আমরা অনেক বেশি সচেতন।

আজকের ব্যস্ত জীবনে কাজ আর স্বাস্থ্য দুটোকেই সমান গুরুত্ত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে সঠিক খাবার বেছে নেওয়াটা সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক অ্যান্টি এজিং ডায়েট আপনাকে সতেজ ও তারুণ্যদীপ্ত রাখতে ভেতর থেকে সাহায্য করবে। তবে চলুন জেনে নিই, অ্যান্টি এজিং ডায়েটে কোন খাবারগুলি রাখা উচিত।

অ্যান্টি এজিং ডায়েট সম্পর্কে যত কথা
সময়ের সাথে সাথে ত্বক তাঁর উজ্জলতা হারাবেই, এটা অবশ্যম্ভাবী হলেও নিজের বয়স বাড়ার বিষয়টি আমরা কেউই মেনে নিতে চাই না। প্রতিনিয়ত যে হারে দূষণ আর স্ট্রেস বাড়ছে, তাতে আমরা অকালেই বুড়িয়ে যাচ্ছি । তাই এমন কিছু প্রতিদিন খাওয়া উচিত যেটা বয়স ধরে রাখতে সাহায্য করবে। শুধুমাত্র ত্বক নয়, এই খাবারগুলির মাধ্যমে আপনার নখ ও চুলের স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে, এবং রক্তের সঞ্চালনও ভালো থাকবে।

তারুণ্য ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় কয়েকটী খাবার 

১) ডালিম (Pomegranate seeds)
ডালিমের রস পেশীকোষের বয়স বেড়ে যাওয়া রোধ করে। ডালিমের বীজ এলাজিক অ্যাসিডের (ellagic acid) খুব ভালো উৎস। এটা ন্যাচারাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে পরিচিত। আর এতেই আপনার ত্বক থাকবে তারুণ্যময় ও গ্লোয়িং। ভিটামিন সি, ভিটামিন-এ সহ আরও অনেক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হওয়ায় অ্যান্টি এজিং ডায়েটে ডালিম অবশ্যই রাখতে হবে।

২) টমেটো (Tomatoes)
পাকা লাল টমেটোতে লাইকোপিন (Lycopene) নামের একটি উপাদান থাকে। লাইকোপিন এর প্রধান যৌগ ক্যারোটিনয়েড (Carotenoid), আর এটার জন্যই টমেটোর রঙ লাল হয়। এটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে ভিটামিন-ই এর চেয়েও বেশি কার্যকর। স্কিন কুঁচকে যাওয়া বা বলিরেখা পড়া দূর করতে পারে টমেটোতে থাকা এই উপকরণটি।

৩) বাদাম (Nuts)
কাঠবাদাম, কাজুবাদাম বা চীনাবাদাম, অ্যান্টি এজিং ডায়েটে সবগুলোই উপকারী। স্বাস্থ্যকর ও প্রয়োজনীয় ফ্যাট, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং আমিষের খুব ভালো উৎস হচ্ছে বাদাম। টিস্যুর ক্ষয়পূরণ এবং হরমোনাল ব্যালেন্স ঠিক রাখতে আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বাদাম রাখা দরকার।

৪) বেরি জাতীয় ফল (Blueberries)
ভিটামিন সি, খনিজ পদার্থ এবং পটাসিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ায় বেরি জাতীয় ফলগুলো ত্বকে বয়সের ছাপ পরতে বাধা দেয়। স্ট্রবেরি, ব্লুবেরির মত গাঢ় রঙের বেরি ফলগুলো আপনাকে তারুণ্যদীপ্ত থাকতে অনেকটাই সহায়তা করবে।

৫) ডার্ক চকলেট (DARK CHOCOLATE)
যারা ডার্ক চকলেট খেতে পছন্দ করেন, এটা তাদের জন্য অবশ্যই সুখবর! কোকো উচ্চ মাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, প্রোটিন ও ভিটামিন বি সমৃদ্ধ। পরিমিত পরিমাণে ডার্ক চকলেট খাওয়া আপনার স্বাস্থ্য, ত্বক, চুল সবকিছুর জন্যই কিন্তু ভালো। গবেষণায় উঠে এসেছে, ডার্ক চকলেটে অ্যান্টি-এজিং প্রোপার্টিজ থাকায় এটা ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং বলিরেখা কমিয়ে ফেলে।

৬) অ্যাভোকাডো (Avocado)
অ্যান্টি এজিং ডায়েটে অ্যাভোকাডো বেশ কার্যকরী। কেননা এতে ভিটামিন ই, পটাসিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে যেগুলো তারুণ্য ধরে রাখে। এটি কোষের পুনর্গঠনে সহায়তা করে, স্কিনকে কোমল রাখে, ত্বকের বলিরেখা রোধ করে, এছাড়াও আরো অনেক কার্যকারিতা আছে।

৭) কলা (Banana)
ভিটামিন বি৬, ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফাইবার এবং আরও অন্যান্য সব পুষ্টি উপাদানে ভরপুর হওয়ায় এই ফলটি রাখুন অ্যান্টি এজিং ডায়েটে। শরীরের জন্য বেনিফিসিয়াল ও দরকারি উপাদান থাকায় নিয়মিত কলা খাওয়া শুরু করুন।

৮) লেবু (Orange)
মেদ কমাতে লেবুর কার্যকারিতা অনেকেরই জানা। কিন্তু এজিং প্রতিরোধে লেবুর ভুমিকা অনেকেই জানেন না। ত্বকের হারিয়ে যাওয়া ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনতে ও বলিরেখা কমাতে লেবু দারুণ কাজ করে। যারা স্কিনের মলিনতা ও বয়সের ছাপ নিয়ে চিন্তিত, তারা ডায়েটে অবশ্যই ভিটামিন সি অর্থাৎ লেবুর জলকে অন্তর্ভুক্ত করুন।

৯) আপেল (Apple)
আপেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এছাড়াও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও খনিজ লবণ থাকায় এটা আপনার ত্বককে সতেজ রাখতে হেল্প করবে।

১০) গ্রিন টি (Green Tea)
তারুণ্য ধরে রাখতে একটি দারুণ কার্যকরী পানীয় হচ্ছে গ্রিন টি। অনেকেই জানেন, এর মধ্যে  অসাধারণ কিছু উপকারিতা থাকার জন্য ডাক্তাররাও নিয়মিত গ্রিন টি খাওয়ার পরামর্শ দেন। সকালে ও বিকালে দুইকাপ গ্রিন টি খাওয়ার অভ্যাস করুন। এটা শরীরের ক্ষতিকর টক্সিন বের করতে হেল্প করবে। সাথে ত্বকের তারুণ্য ধরে রেখে আপনাকে প্রাণবন্ত রাখবে।

১১) তিল বীজ (SESAME SEEDS)

বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড়ের ক্ষয় হতে থাকে, আপনার অবশ্যই হাড়ের যত্ন নেওয়া দরকার। তিলের বীজ-এ আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, এছাড়াও লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস এবং ফাইবার সমৃদ্ধ অন্যান্য খনিজ পাওয়া যায় এর মধ্যে। যা আমাদের হাড়ের ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।

১২) উদ্ভিজ দুধ (FORTIFIED PLANT-BASED MILK)

শক্তিশালী এবং সুরক্ষিত উদ্ভিজ দুধগুলি হাড়-এর পুষ্টির সহায়ক। এগুলি থেকে প্রচুর ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। আপনার প্রতিদিনের ডায়েটে সয়া এবং বাদামের দুধ অন্তর্ভুক্ত করুন।

১৩) আনারস (PINEAPPLES)

আনারস ম্যাঙ্গানিজ নামক খনিজে সমৃদ্ধ, যা প্রোলিডেজ নামে একটি এনজাইম সক্রিয় করার জন্য প্রয়োজন। প্রোলিডাস ত্বকে কোলাজেন গঠনের জন্য অ্যামিনো অ্যাসিড প্রোলিন সরবরাহ করে যা ত্বকের শক্তি এবং স্থিতিস্থাপকতায় ভূমিকা রাখে।

১৪) তরমুজ (WATERMELON)

আপনার ত্বকের বয়স ধরে রাখতে এই গ্রীষ্মকালীন ফলের উপকারিতা অসীম। তরমুজে থাকা লাইকোপিন, সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে রক্ষা করে।  অতিবেগুনী রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করে এবং বয়সের সৃষ্টি করে, ত্বকে পোড়া দাগের সৃষ্টি করে। তরমুজে থাকা জলীয় পদার্থ আপনার ত্বককে শুষ্কতার হাত থেকে রক্ষা করে।

১৫) মাশরুম (MUSHROOMS)

মাশরুম হল এমন একটি খাবার যার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি থাকে, যার অভাবে বেশিরভাগ মানুষ ভুগতে থাকে। ভিটামিন ডি-এর অভাবে আপনি ক্যালসিয়াম সঠিকভাবে শোষণ করতে পারবেন না, যা অস্টিওপোরোসিস, ভাঙ্গা হাড় এবং মেরুদণ্ডের সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

১৬) মিষ্টি আলু (SWEET POTATO)

মিষ্টি আলুতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন এ পাওয়া যায়। এটি ক্ষতিগ্রস্থ কোলাজেনকে পুনরজ্জীবিত করে ত্বকের সূক্ষ্ম বলিরেখা কম করতে সহায়তা করে।

১৭) গাজর (CARROTS)

গাজরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলি ভিটামিন এ সমৃদ্ধ, যা ক্ষতিগ্রস্থ কোলাজেন পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে, যা ত্বকের কোষগুলির স্থিতিস্থাপকতা এবং পুনর্জন্মের জন্য প্রয়োজনীয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে গাজরে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার বৈশিষ্ট্য রয়েছে ।

১৮) ব্রোকলি (BROCCOLI)

আপনি ব্রোকলি পছন্দ করেন নাও করতে পারেন, তবে এটি খাওয়ার একটি ভাল কারণ রয়েছে: ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে এটিতে উদ্ভিজ রঙ্গক লুটিন রয়েছে, যা আপনার ধারাল বুদ্ধিমত্তা বা মস্তিষ্কের সতেজটার জন্য উপকারি।

১৯) বিন্স (BEANS)

আপনার শরীরে প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য উদ্ভিদ-ভিত্তিক অ্যামিনো অ্যাসিড বিন্স থেকে পাওয়া যায়। শিম এর বীজ এবং বিভিন্ন ডালগুলি এর উৎস, এগুলি হতে রোগ-প্রতিরোধী ফাইবার এবং ফাইটোকেমিক্যাল পাওয়া যায়।

২০) দই (YOGURT)

আপনার কোষগুলি তারুন্য ধরে রাখার জন্য দই খুবই উপকারি। এছাড়াও ত্বকের কোষগুলির পুনর্নির্মাণের জন্য সহায়ক। 

২১) হলুদ (TURMERIC)

হলুদ কোষের ক্ষয়ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং বার্ধক্য, ত্বক এবং সমস্ত অঙ্গকে প্রাণবন্ত এবং সুস্থ অবস্থায় রাখতে সহায়তা করে।এর মধ্যে থাকা কারকুমিন, বার্ধক্য এবং অবক্ষয়জনিত রোগের প্রতিরোধ করে।

২২) জইচূর্ণ (OATMEAL)

একটি শর্করা সমৃদ্ধ খাবার যা আপনার দেহের অনুভূতি-হরমোন সেরোটোনিনকে বাড়িয়ে তোলে।

২৩) মনুকা (MANUKA HONEY)

এই নির্দিষ্ট ধরণের মধু , বহু বছর ধরে প্রাকৃতিক ঔষধি হিসাবে ত্বককে সজীব করা  এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হিসাবে ব্যবহার করা হয়। কেন? এটি সাইটোকাইন উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে, যা রোগজীবাণুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং আমাদের সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে।

২৪) পালং শাক (SPINACH)

শুধুমাত্র দুর্দান্ত স্বাদই নয়, পালং শাক-এ প্রচুর পরিমাণে ফাইটোনিট্রিয়েন্ট রয়েছে যা আপনার ত্বকে সূর্যের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। এটিতে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন এবং লুটিন, এমন দুটি যৌগ যা ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা উন্নত করতে সহায়তা করে। 

আরও পড়ুন – শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত খান কাঁচা হলুদ

২৫) ঘি (GHEE)

এই খাবারটি ভারতীয় রান্নাঘরের একটি প্রধান উপাদান।  ঘি আপনার ত্বককে নরম রাখতে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সরবরাহ করে। 

অ্যান্টি এজিং ডায়েট প্ল্যানে কোন খাবারগুলি অবশ্যই রাখতে হবে টা জানা গেল। প্রচুর পরিমাণে জল পান করার সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো হেলদি লাইফস্টাইল-এর অঙ্গ। এছাড়াও রোদ আর দূষণ থেকে দূরে থাকতে হবে। ঠিকমতো অ্যান্টি এজিং ডায়েট মেনে চললে অকাল বার্ধ্যক্য নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *