আয়রন, শিশুদের শারীরিক ও মানুষিক বিকাশের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। শরীরের রক্তের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে আয়রনের প্রয়োজন আছে। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে চার মাস বয়স পর্যন্ত কোনও ধরণের আয়রন সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত গর্ভাবস্থার শিশুরা তাদের মায়েদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর অকাল প্রসবের কারনে, সে আয়রনের ঘাটতিতে ভুগতে পারে। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা পুষ্টির অভাবে এই আয়রনের ঘাটতি হতে পারে।

আয়রনের গুরুত্ব

সন্তানের সঠিক বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য আয়রন একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। আয়রন রক্তের প্রধান উপাদান, আয়রনের অভাব রক্তাল্পতার কারণ হতে পারে, যা সন্তানের দেহের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

আয়রনের ঘাটতি কিভাবে বুঝবেন

সন্তানের দেহে আয়রনের ঘাটতি থাকলে আপনি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখতে পাবেন।

  • ফ্যাকাশে ত্বক
  • ক্ষুধামন্দ
  • অবিরাম ক্লান্তি
  • অস্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস
  • বিলম্বিত বৃদ্ধি এবং বিকাশ
  • ঘন ঘন অসুস্থতা

আয়রন সমৃদ্ধ এই খাবারগুলি যা আপনি আপনার শিশুর ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন

আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের দুটি ধরন রয়েছে – হেম এবং নন-হেম। হেম-আয়রন সাধারণত প্রাণীজাতীয় পণ্য বিশেষত পোলট্রিজাত খাবারে এটি পাওয়া যায়। হেম-আয়রন নন-হেম আয়রনের চেয়ে দ্রুত শরীরে শোষিত হয়। এছাড়া প্রচুর নিরামিষ আয়রনযুক্ত খাবারও রয়েছে বাচ্চাদের জন্য। নীচে শিশুদের জন্য আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

১. মাংস এবং পোলট্রিজাত খাবার, এগুলি হেম আয়রনের বিশেষ উৎস, বিশেষত লাল মাংস এবং লিভার। রান্নার আগে মাংসের সমস্ত চর্বিযুক্ত অংশগুলি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ এতে কোনও আয়রন নেই। বাচ্চাকে খাওয়ানোর আগে আপনার মাংস ভালভাবে রান্না করা উচিত। অন্যথায়, তাদের পক্ষে সহজে হজম করা কঠিন হতে পারে।

২. ডিমের কুসুম, শিশুদের জন্য আয়রনের আরেকটি ভাল উৎস। ডিম সহজেই পাওয়া যায় এবং রান্না করা ও খাওয়া সহজ।  এটি আপনার শিশুর নিয়মিত আয়রনের চাহিদা মেটায়।

৩. লাল এবং খয়েরি চাল, শিশুদের জন্য নন-হেম আয়রনের দুর্দান্ত উৎস।

৪. ডাল জাতীয় শস্য নন-হেম আয়রনে সমৃদ্ধ। মুসর ডাল, রাজমা, ছোলা এবং সয়াবিন এর উদাহরণ। আপনি এই ডালগুলি সেদ্ধ করে আপনার বাচ্চাকে দেওয়ার আগে কিছুটা নুন ও হালকা মশলা দিয়ে সেগুলিতে স্বাদ যোগ করতে পারেন। এগুলি আপনি ভাতের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।

৫. মিষ্টি আলু এবং আলু, আয়রন ধরে রাখার জন্য অবশ্যই এগুলি খোসা সহ সেদ্ধ করতে ভুলবেন না। সেদ্ধ করা আলু বা মিষ্টি আলু বেশিরভাগ বাচ্চার কাছে প্রিয়।

৬. সামুদ্রিক খাবার, আপনার সন্তানের জন্য আয়রন সহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের উৎস।  টুনা, বাটা, চিংড়ি আরও অনেক সামুদ্রিক মাছ আয়রনের সেরা উৎস। এগুলি আপনি বিভিন্ন উপায়ে রান্না করে নিয়মিত আপনার শিশুকে খাওয়াতে পারেন। তবে কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে এই ধরনের খাবার থেকে অ্যালার্জি হতে পারে, সে ক্ষেত্রে আপনাকে সচেতন থাকতে হবে।

আরও পড়ুন – মাংসের থেকেও বেশি খাদ্যগুণ পাওয়া যায় এই নিরামিষ খাবারগুলিতে

৭. চিনাবাদাম থেকে তৈরি মাখন বা পিনাট বাটার, বাচ্চাদের পছন্দের এই খাবারে প্রচুর আয়রনে থাকে। বিশেষত পাউরুটি বা রুটির সাথে এটি ব্যবহার করা হয় ।

৮. তোফু, নিরামিষাশীদের জন্য মাংসের বিকল্প হিসাবে, তোফুতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন রয়েছে।

৯. আলুবোখরা এবং ক্র্যানবেরি, এইগুলি আয়রন সমৃদ্ধ ফল। এগুলির মিষ্টি স্বাদ শিশুদের বেশ পছন্দের । তবে প্রতিদিন তাদের এক গ্লাসের বেশি না দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হন। এর রস ( মূত্রনালীর ) স্বাস্থ্যের জন্য ভাল এবং কোষ্ঠকাঠিন্যও রোধ করে। এতে কোনও ফ্যাট বা কোলেস্টেরল থাকে না।

১০. শুকনো বীজ, সূর্যমুখী, কুমড়ো এবং তিল ইত্যাদি বীজে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয়রন রয়েছে। আপনি এগুলি পুডিং এবং অন্যান্য মিষ্টির মধ্যে ব্যবহার করতে পারেন।

১১. গম এবং ওটমিল, এগুলির মধ্যে সর্বাধিক পরিমাণে আয়রন থাকে। ওটমিলের মাত্র এক বাটি আপনার শিশুর দৈনিক আয়রনের প্রয়োজনীয়তার প্রায় ৬০% সরবরাহ করতে পারে। এক বাটি গমের ক্রিম আপনার সন্তানের প্রতিদিনের লোহার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারে। তবে, নন-হেম আয়রন হওয়ায় শরীরের পক্ষে সমস্ত আয়রন শোষিত করা কঠিন হতে পারে।

১২. শুকনো ফল, শুকনো খেজুর, এপ্রিকট, আলুবোখরা এবং কিসমিস, সবগুলিতেই প্রচুর পরিমাণে আয়রন পাওয়া যায়। আপনার সন্তানকে মুখরোচক খাবার হিসাবে এগুলি দিতে পারেন। এটি একটি ভাল অভ্যাস যা সন্তানের সাথে আপনিও খেয়ে যেতে পারেন।

১৩. সবুজ শাক-সবজী, পালং শাক, ব্রোকলি, কলার্ড এবং ক্যাল আয়রন ও অন্যান্য অনেক প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ।

১৪. টমেটো, হেম আয়রনের বিশেষ উৎস এই টমেটো আপনি বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার এবং স্যুপ তৈরি করে খেতে পারেন। টমেটো সসের সাথে স্প্যাগেটি কিংবা হালকা স্বাদযুক্ত টমেটো স্যুপ আপনার সন্তানের খাবারকে মজাদার করে তুলতে পারে।

১৫. জৈব ডার্ক চকোলেট, প্রত্যেক বাচ্ছারাই চকোলেট পছন্দ করে। অনেক সময় বড় হয়ে গেলেও এই চকোলেট খাবার অভ্যাস থেকে যায়, বন্ধ হয় না। তাদের অভিলাষ পূরণ করার আর একটি উপায় হল জৈব ডার্ক চকোলেট। এগুলিতে আয়রন থাকার পাশাপাশি চিনিও কম থাকে।

আরও পড়ুন – খেজুর: শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ায়

যে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে তাদের কোনও আয়রন সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না। যেসব বাচ্চারা পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রনের সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করে তাদেরও কোন পরিপূরক প্রয়োজন হয় না। বাচ্চাদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতি হলে তারা ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, মনসংযোগে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। তাই প্রতিদিন, আপনার শিশুর ডায়েটে কমপক্ষে দুটি করে আয়রনযুক্ত খাবার রাখার চেষ্টা করুন।

তথ্যসূত্রঃ পেরেটিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *